চাঁদের উৎপত্তি কীভাবে হলো?

আমি নিশ্চিত আমার মতো, শতকরা ১ ভাগ হলেও, কেউ না কেউ হাইওয়ের ঘোরগাড়ী কিংবা অড সিগনেচারের ঘুম শুনতে শুনতে জ্যোৎস্না রাতের সেই অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা চাঁদের দিকে মহিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলো ঘন্টার পর ঘন্টা। বিষয়টা ভাবতেই ভেতরে ভেতরে এক প্রকার অপ্রতিরোধ্য বিস্ময়ের অনুভূতি তৈরী হয় যে, এই পৃথিবীর বাহিরেও আধারের আলো হয়ে সদম্ভে বসে আছে এক মনমুগ্ধকর বস্তু। তবে কিভাবে এই শোভাময় চন্দ্রের উৎপত্তি ঘটলো? অনেকে বলে পৃথিবীর সঙ্গে আরেক সেলেস্টিয়াল বস্তুর সঙ্ঘর্ষে এর উৎপত্তি। তবে আসলেই কি তাই?

চাঁদের উৎপত্তি সম্পর্কে নানা তত্ত্ব আছে – সাঙ্ঘর্ষিক কিংবা অসাঙ্ঘর্ষিক। যেমন ক্যাপচার তত্ত্ব (Capture theory) বলে, পৃথিবীর উচ্চতর মাধ্যাকর্ষণ, সৌরজগতের অন্য কোথাও গঠিত একটি পাথুরে দেহকে, পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে টেনে নিয়েছিল, যেটাকে আমরা এখন লুনা অর্থাৎ পৃথিবীর চাঁদ হিসেবে চিনি। তবে এদের দেহ চাঁদের মতো গোলাকার দেহ না হয়ে প্রায়শই অদ্ভুত আকৃতির হয়।

চিত্রঃ Capture Theory

আবার ফিসন তত্ত্ব (Fission theory) অনুযায়ী পৃথিবী এত দ্রুত ঘুরছিল যে কিছু উপাদান ভেঙ্গে চাঁদে পরিণত হয়ে গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছিল। তবে, যদি চাঁদ অন্য কোথাও তৈরি হয়ে থাকে এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা বন্দী হয়ে থাকে তবে এর গঠন পৃথিবীর থেকে খুব আলাদা হবে। কিন্তু আদতে পৃথিবী ও চাঁদের গঠন প্রায় একই রকম। আবার যদি চাঁদ একই সময়ে তৈরি হয়, বা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে চাঁদে খনিজ পদার্থের ধরন এবং অনুপাত পৃথিবীর মতোই হবে। তবে তারা প্রায় এক হলেও পুরোপুরি এক নয়, কিছুটা আলাদা। তাই বর্তমানে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি গৃহীত তা হলো জায়েন্ট ইম্প্যাক্ট তত্ত্ব (Giant impact theory)।

চিত্রঃ FissionTheory

পৃথিবী এবং চাঁদের আগে, প্রোটো-আর্থ এবং থেইয়া (Theia) নামক একটি মোটামুটি মঙ্গল-আকারের গ্রহ ছিল। জায়েন্ট ইম্প্যাক্ট তত্ত্ব অনুযায়ী গ্রহটি পৃথিবীর সাথে ধাক্কা খেয়ে পৃথিবীর ভূত্বকের বাষ্পীভূত অংশকে মহাকাশে ফেলে দেয়। মাধ্যাকর্ষণ নির্গত কণাগুলিকে একত্রে আবদ্ধ করে একটি চাঁদ তৈরি করে যা তার হোস্ট গ্রহের তুলনায় সৌরজগতের বৃহত্তম।

চিত্রঃ Giant Impact

এই ধরণের গঠন ব্যাখ্যা করবে কেন চাঁদ প্রধানত হালকা উপাদান দিয়ে গঠিত যা পৃথিবীর তুলনায় কম ঘন। যে উপাদানটি এটি তৈরি করেছে তা ভূত্বক থেকে এসেছে, যখন গ্রহের পাথুরে কোরটি অস্পৃশ্য রয়েছে। যেহেতু উপাদানটি থেইয়ার মূল অংশের বাকি অংশের চারপাশে একত্রিত হয়েছে, এটি পৃথিবীর গ্রহন সমতলের কাছে কেন্দ্রীভূত হবে। সূর্য আকাশের মধ্য দিয়ে যে পথে ভ্রমণ করে, সেখান দিয়েই আজ চাঁদও এই কারণে প্রদক্ষিণ করে।

তবে যদিও এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্ব, এটারও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে । বেশিরভাগ মডেলই পরামর্শ দেয় যে চাঁদের ৬০% এর বেশি থেইয়া থেকে আসা উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়া উচিত।কিন্তু অ্যাপোলো মিশন থেকে পাওয়া পাথরের নমুনা অন্য কথা বলে।

চিত্রঃ Lunar Rock

হাইফার ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (Israel Institute of Technology in Haifa) অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট Alessandra Mastrobuono-Battisti এর মতে, “গঠনের দিক থেকে কিছু পার্থক্য বাদ দিলে পৃথিবী এবং চাঁদ প্রায় যমজ।” এই তথ্যটি জায়েন্ট ইম্প্যাক্ট তত্ত্ব মডেলের উপর একটি দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। ২০১৭ সালে, ইসরায়েলি গবেষকরা একটি বিকল্প প্রভাব তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন যা পরামর্শ দেয় যে চাঁদ বিভিন্ন ধরণের ছোট সংঘর্ষের ফল হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, প্রতিটি সংঘর্ষ প্রোটো-আর্থের চারপাশে একটি ধ্বংসাবশেষের ডিস্ক তৈরি করে এবং তারপরে একটি মুনলেট তৈরি করে। মুনলেটগুলি টাইডালি বাইরের দিকে অগ্রসর হয় এবং একত্রিত হয়ে চাঁদ তৈরি করে। উপ-চন্দ্র মুনলেটগুলি প্রাথমিক সৌরজগতে প্রোটো-আর্থের উপর প্রত্যাশিত প্রভাবগুলির একটি সাধারণ ফলাফল । বহু-প্রভাবের ফলে মুনলেটের এই দক্ষ একীভূতকরণ পৃথিবী-চাঁদ সিস্টেম গঠনের জন্য দায়ী হতে পারে যা প্রমান করতে পারে চাঁদ ও পৃথিবীর গঠন একই রকম কেন।

চিত্রঃ Multiple Impact Theory

এ ক্ষেত্রে আরও একটা সম্ভাবনা আছে যেটার নাম দেয়া হয়েছে কো-ফর্মেশন তত্ত্ব (Co-formation theory)। ২০১২ সালে, টেক্সাসের সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (Southwest Research Institute ) গবেষক Robin Canup প্রস্তাব করেছিলেন যে পৃথিবী এবং চাঁদ একই সময়ে তৈরি হয়েছিল যখন মঙ্গল গ্রহের পাঁচগুণ আকারের দুটি বিশাল বস্তু একে অপরের সাথে বিধ্বস্ত হয়েছিল। “সংঘর্ষের পর, দুটি একই আকারের দেহ আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং একটি প্রাথমিক পৃথিবী তৈরি করে যা একটি চাকতি দ্বারা বেষ্টিত হয় যেখান থেকে চাঁদ তৈরি হয়,” নাসা বলেছে। 

চিত্রঃ Co-formation (Before collision, during formation of Earth)

তবে, ২০২০ সালে নেচার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায়, কেন চাঁদ এবং পৃথিবীর একই রকম গঠন রয়েছে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অ্যাপোলো মহাকাশচারীদের কাছ থেকে পৃথিবীতে আনা চাঁদের শিলাগুলির অক্সিজেনের আইসোটোপগুলি অধ্যয়ন করার পরে, গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে পৃথিবীর শিলাগুলির সাথে তুলনা করার সময় একটি ছোট পার্থক্য রয়েছে। গভীর চন্দ্রের আবরণ (ভুত্বকের নীচের স্তর) থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলি পৃথিবীতে পাওয়া নমুনাগুলির তুলনায় অনেক বেশি ভারী ছিল এবং আইসোটোপিক রচনাগুলি প্রোটো-চন্দ্রের প্রভাবক থেইয়া-এর সবচেয়ে প্রতিনিধিত্ব করে। এই তথ্য আবার জায়েন্ট ইম্প্যাক্ট তত্ত্বকে যথার্থ প্রমান করে। তবে এখনো জোড় দিয়ে একথা বলা যাচ্ছে না কারণ নমুনাগুলো চাঁদের কেবলমাত্র একটি জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। 

এখন বিষয় হচ্ছে এই সকল তত্ত্ব দাবি করে যে চাঁদ তৈরি হয়েছে মাস বা বছর ধরে কক্ষপথে একত্রিত হয়ে। একটি নতুন সিমুলেশন একটি ভিন্ন তত্ত্বকে তুলে ধরে – চাঁদ অবিলম্বে গঠিত হতে পারে, কয়েক ঘন্টার মধ্যে, যখন প্রভাবের পরে পৃথিবী এবং থেইয়া থেকে উপাদান সরাসরি কক্ষপথে চালু করা হয়েছিল। এই দ্রুত, একক-পর্যায়ের গঠন তত্ত্ব অন্যান্য অমীমাংসিত রহস্যের উত্তর খোঁজার নতুন উপায়ও দিতে পারে। এই দৃশ্যকল্পটি চাঁদকে একটি প্রশস্ত কক্ষপথে একটি অভ্যন্তরীণ অংশে রাখতে পারে যা সম্পূর্ণরূপে গলিত নয়, সম্ভাব্যভাবে চাঁদের হেলানো কক্ষপথ এবং পাতলা ভূত্বকের মতো বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যা করে। এটি চাঁদের উৎসের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে একটি ৷

অতএব বোঝাই যাচ্ছে, চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে এখনো সন্দিহানের শেষ নেই। এখনো অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে আমাদের এই গোলাকার বন্ধুকে নিয়ে। তবে তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের যে জোয়ার বইছে, তা থেকে আশা করা যায় খুব শীঘ্রই আমরা আরো অনেক রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবো। নাসার আসন্ন আর্টেমিস মিশন এই লক্ষেই অগ্রসর হচ্ছে। এই তত্ত্বগুলির মধ্যে কোনটি সঠিক তা নিশ্চিত করার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য আর্টেমিস মিশন থেকে অধ্যয়নের জন্য পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা ভবিষ্যতের চন্দ্রের নমুনাগুলির বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে। বিজ্ঞানীরা চাঁদের অন্যান্য অংশ থেকে এবং চাঁদের পৃষ্ঠের গভীর থেকে নমুনাগুলিতে অ্যাক্সেস লাভ করার সাথে সাথে, তারা তুলনা করতে সক্ষম হবেন কীভাবে বাস্তব-বিশ্বের ডেটা এই সিমুলেটেড পরিস্থিতিগুলির সাথে মেলে। তবে যত যাই হোক, এই মহাবিশ্ব যে অসংখ্য রহস্যের পাকঘর সেই বিষয়টাই আবারো প্রমানিত করে দেয় আমাদের এই চিরমনোহর চাঁদ।

1 Comment

  1. খুব সুন্দর হয়েছে। আরও আরও লিখতে হবে, অজানাকে জানাতে হবে মানুষকে।

Leave a Reply to বাসু মৈত্র Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!