
গভীর রাত , ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি । বাড়ির উঠোনে বসে হঠাৎ লক্ষ্য করলে দেখা যায় আকাশ জুড়ে অসংখ্য তারা ঝলমল করছে । তুমি যদি মহাকাশ নিয়ে ভাবতে ভালবাসো তাহলে তুমি হয়ত খেয়াল করবে অনেকগুলো তারার মাঝে তিনটি তারা বুঝি এক লাইন এ এসে দাঁড়িয়েছে । তোমরা কি জানো , এই তারকা বিন্যাস আমাদেরকে কোন নক্ষত্র মণ্ডলের কথা মনে করিয়ে দেয় ? এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় কালপুরুষ তারামণ্ডলের ( Orion constellation ) এর কথা । কালপুরুষ আকাশের সবচেয়ে পরিচিত তারামণ্ডল। আর এই যে লাইনটির কথা বললাম , এর নাম “Orion Belt” । ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে পৃথিবীর প্রায় সব জায়গা থেকে এই তারামণ্ডল (orion constellation) এর দেখা মেলে ।যখন তুমি Orion Belt খুঁজে পাবে , এর ঠিক নিচেই দেখবে এক সারি ঝাপসা তারা মিট মিট করে জ্বলছে ।

Greek mythology অনুসারে তারার এই সারি নির্দেশ করে Ryan এর তলওয়ার । এই তো গেল প্রাচীন উপকথা দিয়ে পরিচয় । আসল পরিচয় যে এখনও বাকি । তার আগে আসো আমরা আরেক্তু কাছ থেকে Ryan এর তলওয়ার টাকে দেখি … অনেক গুলো তারার মাঝে একটা লাল আভা দেখা যাচ্ছে খেয়াল করেছো ? এটাই হচ্ছে আমাদের কালপুরুষ নিহারিকা বা Orion Nebula । এটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল নিহারিকা যা অবিশ্বাস্য হলেও আমাদের থেকে ১৫০০ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত । তার মানে আমরা যেই ছবিটা দেখতে পাচ্ছি , তা হল নীহারিকাটির ১৫০০ বছর আগের অবস্থা !!

কি , মজার না? চলো এইবার Hubble Telescope দিয়ে আরেক টু ভালভাবে দেখে আসি …

এটাই হচ্ছে Orion Nebula । এটি হল এক প্রকার Star Factory , যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে । এখানে যে রঙ্গিন ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছ , ওদেরকে বলা হয় মহাজাগতিক মেঘ ( intersteller cloud) । এর বিভিন্ন রং এতে উপস্থিত গ্যাস গুলোকে নির্দেশ করে । মহাকর্ষ বলের কারণে মহাজাগতিক অনু পরমানু গুলো একে অপরের কাছে আসতে থাকে । তৈরি হয় মহাজাগতিক মেঘ । মেঘ গুলো আরও সাথী নিয়ে আসে । ফলে ভর বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে বল । অনু পরমানু গুলো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে প্রচণ্ড তাপ শক্তির জন্ম দেয় । এই তাপমাত্রা যখন ১০ মিলিয়ন ডিগ্রি কেলভিন পর্যন্ত পৌঁছে যায় ,তখনই সে মেঘ পুঞ্জকে আমরা বলি নক্ষত্র ।শুরু হয় Nuclear fusion । প্রতিনিয়ত জন্ম নিতে থাকে অসংখ্য নক্ষত্র আর এদের ঘিরে জন্মায় অসংখ্য গ্রহ- উপগ্রহ । আমাদের সৌরজগৎ ও কিন্তু এভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল ।
নেবুলা আসলে কি এটা কিভাবে star factory হল সেটা তো তোমরা বুঝলে । এখন তোমাদের মনে যে প্রশ্ন আসবে সেটা হল , এই যে এতো গুলো রং এগুলোর কারণ ই বা কি । আসলে এই লাল আভা সৃষ্টি হয় হাইড্রোজেন গ্যাস এর মেঘ থেকে । তরুণ নক্ষত্র গুলো থেকে আসা রশ্মি হাইড্রোজেন পরমাণুকে উত্তেজিত করে । ফলে নির্গত হয় এই লাল আভা ।কিছু দৃশ্যমান আলো আবার মহাজাগতিক গ্যাস দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়।যার মধ্যে অন্যতম হল নীল রঙ ।তবে দেখতে ই পাচ্ছ যে নীল রঙের পরিমাণ লাল এর তুলনায় অনেক কম । আরেকটা রঙ যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা হল সবুজ । ছবির এই সবুজ রঙ অনেক বছর বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে । কেননা আমাদের জানাশোনা কোন পরমাণুই সাধারণ অবস্থায় সবুজ রঙ নির্গত বা বিক্ষিপ্ত করেনা । বিজ্ঞানীরা তখন ধরে নিলেন অচেনা পদার্থ , “ Nebulae” এই সবুজ রঙ নিঃসরণের কারণ । পরবর্তীতে অনেক গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে ee+ অক্সিজেন পরমাণুর ইলেক্ট্রন কিছু বিরল transition ই মূলত এই সবুজ রঙের কারণ ।
Orion Nebula তে বিভিন্ন আকারের প্রায় ৩০০০ নক্ষত্র আছে । যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে “Rigel” । এটি পৃথিবীর আকাশের ৭ম উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং Orion constellation এর সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা ।আমাদের সূর্যের চেয়ে ২০০,০০০ গুন বেশি উজ্জ্বল এই তারাটি হল একটি Blue-White Super Giant ।

নীহারিকাটিকে উজ্জ্বল করে রেখেছে চারটি হাশিখুশি উজ্জ্বল নক্ষত্র । তাদেরকে একসাথে বলা হয় “Trapezium” । দেখতে চার কোণা trapezium অর্থাৎ চারটি তারা মনে হলেও এখানে আসলে ছয়টি উজ্জ্বল তারকা দাঁড়িয়ে আছে । এতে আছে ২ টি Binary System । ছয়টি তারার প্রত্যেকটিই সূর্যের চেয়ে ১৫-৩০ গুন বড় ।

Trapezium এর চারপাশে রয়েছে গ্যাস ডিস্ক সহকারে ঘূর্ণ্যমান কম বয়সী অসংখ্য তারা । যার চারপাশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন গ্রহ-উপগ্রহ । এছাড়াও নীহারিকাটিতে রয়েছে আরও কিছু নক্ষত্র যাদের চারপাশে ও গ্যাস ডিস্ক আছে । কিন্তু এদের ঘটনা বাকিদের চেয়ে ভিন্ন । এদের ঘিরে থাকে শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্র । এদের থেকে খুব দ্রুত গতিতে গ্যাস নিঃসরণ হতে হতে একটা সময় বন্ধ হয়ে যাবে । তারাও আমাদের সূর্যের মত তারায় পরিণত হবে । উল্লেখ্য যে সব মহাজাগতিক গ্যাস আর ধুলাই যে নক্ষত্র তৈরি করবে , এমনটা নয়।
কি ভাবছ ? ঘুরে আসবে কালপুরুষ নীহারিকা থেকে ? যাওয়ার জন্যে খারাপ জায়গা নয় তো বটেই । কিন্তু যাত্রা পথে কত সময় লাগতে পারে সেই হিসাব আমি জানিনা বাপু !
নীহারিকাটি জুড়ে আছে আরও কিছু Brown Dwarf । যারা হওয়ার জন্য আকারে খুব ই ছোট । তারা এমনকি তাদের মধ্যে nuclear fusion কেও টিকিয়ে রাখতে পারেনা ।