মঙ্গলগ্রহে তোলা হলো সেলফি
সেলফি কি শুধু ইয়াং জেনারেশনের মানুষজনই তোলে? নাহ, বরং এখন আর সেলফি তোলার ব্যাপারটা কেবল মানুষে থেমে নেই। আজকাল রোবোটও সেলফি তুলছে, শুধু তাই-ই নয়, তাদের সেলফি সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশ ভাইরালও হচ্ছে! এই যেমন ক’মাস আগেই এক রোবোট-সেলফি বেশ ভাইরাল হলো। কারণ সেলফিটা যে তোলা হয়েছিল মঙ্গলগ্রহে!
চিত্রঃ Perseverance এর রোবোটিক হাতে তোলা সেলফি, পেছনে Ingenuity Mars Helicopter (সূত্রঃ নাসা)
উপরের ছবিটা তোলা হয়েছিল গত বছরের ০৬ এপ্রিল, যা ছিল মঙ্গলগ্রহ অভিযানের ৪৬তম দিন। এরপর যখন ছবিটা নাসার অফিশিয়াল সাইটে প্রকাশ করা হয় তখন মহাকাশপ্রেমী, মঙ্গলপ্রেমী, রোভারপ্রেমী একদম নির্বিশেষে সবার মাঝে রীতিমত উত্তেজনার ঝড় বয়ে যায়। তবে প্রথমেই আমার কিছু ভুল শুধরে নিই। এ লেখার প্রথম থেকেই আমি রোবোট রোবোট বলে আসছি, এর কিন্তু বেশ সুন্দর একটা নাম আছে, সেটা ধরেই নাহয় ডাকা যাকঃ ‘Perseverance’, অর্থাৎ বাংলায় ‘প্রচেষ্টা’। আর Perseverance কে ঠিক ‘রোবোট’ না বলে, ‘রোভার’ বলা শ্রেয়। রোবোট-রোভার প্রায় সমার্থক হলেও এর মাঝে কিন্তু খুব সুক্ষ্ম একটা তফাৎ আছে। রোবোট বলতে এমন যন্ত্রকে বুঝানো হয় যা মানুষের বানানো যে কোনো প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে। যেমনঃ টিভিতে অনেক সময় বিভিন্ন কোম্পানীর বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, রোবোটিক হাতের মত একটা জিনিস প্যাকেজিং করছে। এমন স্থির কিংবা গতিশীল যেকোনো প্রোগ্রামড যন্ত্রকেই রোবোট বলা চলে। আর রোভার অর্থ সোজা বাংলায় ‘ভবঘুরে’, মানে যে যন্ত্র ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়িয়ে বিভিন্ন ডেটা সংগ্রহ করতে পারে। এখন Perseverance মঙ্গলগ্রহে ঘুরে ঘুরে সেখানকার পাথর, মাটি, অনুজীব খুঁজে বেড়াচ্ছে তার প্রোগ্রাম অনুযায়ী, কোনো রকম রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই। সুতরাং Perseverance কিন্তু রোবোট-রোভার দুটোই। তবে একে রোভার না বলে রোবোট বলে ডাকা অনেকটা মানুষকে মানুষ না বলে ‘Mammal’ বলে ডাকার মত ব্যাপার! যাই হোক, সেলফি প্রসঙ্গে আসা যাক। Perseverance তার নামের স্বার্থকতাও একদম বহাল রেখেছে। কিভাবে? আচ্ছা, আমরা নিজেরা সেলফি তোলার সময় আসলে পর পর কতগুলো ছবি তুলি? ৫টা? ১০টা? খুব বেশি সেলফিপ্রেমী হলে নাহয় ২০টা-ই? Perseverance এক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছে আমাদের সবাইকে। সে তার সেলফি তৈরি করতে একটি দু’টি নয়, একেবারে ৬২টা ছবি তুলেছিল! এই ৬২টা ছবিকে পৃথিবীতে পাঠানোর পরে, সেই ছবি সিমুলেশান করে পিক্সেল আকারে জোড়া লাগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি বানানো হয়েছে। এতে স্বীকার করতেই হয়, ‘প্রচেষ্টা’র প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। মজার ব্যাপার হলো, Perseverance কিন্তু একা একা সেলফি তোলেনি, সে Ingenuity নামের Mars Helicopter কে সংগে নিয়ে সেলফিটি তুলেছে। ভালভাবে লক্ষ্য করলে নিচের ছবিতে, Perseverance থেকে প্রায় ১৩ ফিট দূরে থাকা Ingenuity Mars Helicopter কে খুঁজে পাওয়া যায়।
চিত্রঃ Perseverance এর সাথে Ingenuity Mars Helicopter এর সেলফি । সূত্রঃ নাসা
অনেকের মাঝে কৌতুহল জাগতে পারে, Perseverance কোন ডিভাইস দিয়ে সেলফি তুলেছে? রোবোটিক হাতের প্রান্তে থাকা ওয়াটসন ক্যামেরা (WATSON: Wide Angle Topographic Sensor for Operations and Engineering) দিয়ে Perseverance মার্স হেলিকপ্টারের সাথে এই ডুয়েল সেলফিটা তুলেছিল। রোভারের রোবোটিক হাতটা খানিকটা সেলফি স্টিকের মত কাজ করেছে। তবে এই ক্যামেরাটা আসলে সেলফি তোলার কথা মাথায় রেখে বানানো হয়নি। এটা বানানো হয়েছিল যাতে Perseverance মঙ্গলের মাটি, পাথর, অনুজীব ইত্য্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ছবি তুলে পাঠাতে পারে। আর একারণে এ ক্যামেরাটা খুব ছোট পরিসরের ছবি ধারণ করতে পারত, ফলে তা দিয়ে সেলফি তোলা খুবই দুরূহ ব্যাপার ছিল। কিন্তু নাম যার Perseverance, সে কি আর কঠিন কাজে থেমে থাকবে?
চিত্রঃ Perseverance এর তোলা মঙ্গলের ভূমি (সূত্রঃ নাসা)
পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীদের নতুন পাঠানো প্রোগ্রাম বা নির্দেশ অনুযায়ী তাই Perseverance ডজনখানেক ছবি তুলে গেছে যতক্ষণ না তাকে ও মার্স হেলিকপ্টারকে একই ফ্রেমে আনা গেছে। এ তো গেল Perseverance রোভারের Perseverance এর গল্প। কিন্তু Perseverance এর এখানেই ইতি হয়নি। ৬২টা ছবি পৃথিবীতে আসার পর তা সিমুলেশান করে পূর্নাঙ্গ ছবি তৈরি করা ছিল আরেক Perseverance এর ব্যাপার। এ অসাধ্য সাধন করেছিল Malin Space Science Systems (MSSS) এর ইমেজ প্রসেসিং ইঞ্জিনিয়াররা। শুধু তারাই নয়, মার্স মিশনের সবাই পৃথিবীতে বসে রীতিমত না ঘুমিয়ে পরিশ্রম করে এই অসাধ্য সাধন করেছিল। কারণ মার্সের দিন পৃথিবীর দিনের তুলনায় প্রায় আধঘণ্টা বেশি, তাই মার্সের দিনের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
চিত্রঃ Perseverance এর তোলা সেলফি, ৬২টা পিক্সেল আকারে (সূত্রঃ নাসা)
এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এত যখন কষ্টের ব্যাপার, তাহলে Perseverance কে সেলফি তুলতে বলা হয়েছিল কেন? কারণ বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করতে চাইছিলেন যে Perseverance এর সব বডি পার্ট ঠিক ঠাক কাজ করছে কিনা। মার্সের নতুন পরিবেশে এর বডিতে কোথাও ক্ষয় হতে শুরু করেছে কিনা এটা জানাই মূলত বিজ্ঞানীদের মেইন টার্গেট ছিল। মঙ্গলগ্রহের আবহাওয়া ও পরিবেশ সম্পর্কে তো এখনো মানুষ সেভাবে বিস্তারিত জানতে পারেনি, ফলে হতেই পারে, মঙ্গলে এমন কোনো উপাদান আছে যা রোভারের কোনো পার্টের সাথে বিক্রিয়া করে এর ক্ষতি করে। এখন মঙ্গলগ্রহের মত নির্জন জায়গায় Perseverance এর ছবিই বা কে তুলে দিবে? ডিসি সুপারহিরো মুভির মত সবুজ রংয়ের মার্সিয়ান ভদ্রলোকের দেখা পেলে নাহয় সে তুলে দিতে পারত! কিন্তু বিধি বাম, মঙ্গলে ভবঘুরের মত দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েও Perseverance বেচারা কোনো মঙ্গলবাসীর দেখা পায়নি না আজ পর্যন্ত। অগত্যা, নিজের ছবি নিজেরি তুলতে হলো এত কষ্ট করে! Perseverance শুধু যে ছবিই তুলেছিল তাই-ই নয়, সে ভিডিও রেকর্ড করেও পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। ভিডিওতে বেশ স্পষ্টভাবেই শোনা গেছে, Perseverance এর রোবোটিক হাত নাড়িয়ে ক্যামেরা ফিক্স করার শব্দ। নাসা মার্সের ওয়েবসাইটে ঢু মেরে তোমরাও সেই যুগান্তকারী ভিডিও দেখে নিতে পারো! তবে ইদানিং Perseverance এর সেলফির যে জয়-জয়কার, তাতে ধারণা হতে পারে, Perseverance ই বুঝি সর্বপ্রথম রোভার যে নিজের সেলফি তুলেছে। কিন্তু না, ২০১২ সালেই, Curiosity নামের রোভার সর্বপ্রথম সেলফি তুলেছিল। Perseverance কে নিয়ে মাতামাতির কারণ সে মঙ্গলগ্রহে সেলফিটা তুলেছে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, Perseverance এর মঙ্গল অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলোঃ এস্ট্রোবায়োলোজি নিয়ে গবেষনার তথ্য জোগান দেয়া, যেমনঃ মঙ্গলের পাথরগুলো কেমন, মাটি কেমন, ওখানে কোনো অনুজীবের অস্তিত্ব আছে কিনা ইত্যাদি নিয়ে জরিপ করা।
চিত্রঃ Perseverance এর তোলা মঙ্গলগ্রহের ছবি (সূত্রঃ নাসা)
Perseverance এর খুঁজে আনা এসব ডেটা কাজে লাগিয়ে খুব শীঘ্রই মানুষ এ লালগ্রহে পা রাখতে যাচ্ছে। তবে তার আগে ট্রায়াল হিসেবে আর্টেমিস মিশন করা হবে, যেখানে আগে চাঁদে অভিযান করে এস্ট্রোনটরা কিছু অভিজ্ঞতা নিবে। সেই দিনের আর বেশি বাকি নেই যেদিন বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, এস্ট্রোনটরা আমাদের এত এত কল্পকাহিনীর উৎস- লাল গ্রহ মঙ্গল-এ পাড়ি জমাবে।

ঘরে বসে শিখে ফেলুন জ্যোতির্বিজ্ঞানের বেসিক বিষয়গুলো

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!